Monday, May 16, 2022
First Bangla Newspaper In Buffalo,NY


ফুল

By বাফেলো বাংলা , in Blog , at জানুয়ারী 10, 2020

মনিরা প্রিতু: 
ফুলগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় এক অমোঘ টানে দাঁড়িয়ে গেলাম। হাত নেড়ে ডাকেনি বলছো? ওরা আমায় ঠিক ডাকে। আমিই শুধু সে ডাক শুনতে পাই। ফুলগুলোকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে একটু মায়ার হাত বুলিয়ে দিতে দিতেই অনেকটা সামনে এগিয়ে গেলো হাঁটার পার্টনার, আমার যন্ত্রমানব। হাত নেড়ে ডাকছে আমায়।
দেরি না করে টপাটপ মোবাইল বের করে ঝপাঝপ ক্লিক করলাম। ওদের ছবি তুলতে তুলতে সে অনেকটা এগিয়ে এলো আমার আর ফুলগুলোর দিকে। ক্ষাণিক পরে আমার স্বগতোক্তি ‘এগুলো আমি একদিন না একদিন চুরি করবোই’ শুনে আমার সাধ্যের অতিরিক্ত রুলস এন্ড রেগুলেশন মেনে চলা যন্ত্রমানব বললো ‘চুরি করবা কেনো? কিনে দিবো পছন্দ হলে।’
আমি ফিলসফারের মত একটু উদাসীন ভাব নিয়ে বললাম ‘দোকানে পসরা সাজিয়ে যে ফুলগুলো বিক্রি করে সেগুলো নিতান্তই ভালো আর টিপটপ। ত্রুটিহীন না হলে লোকে পয়সা খরচ করে কিনবে কেনো! অই ফুলগুলো আমার কাছে অনেকটা শোকেসে সাজিয়ে রাখা নতুন বইয়ের মতো। নিজ দায়িত্বে বেড়ে উঠা, অযত্নে অবহেলায় বড় হওয়া ফুল দোকানের ফুলের মতো নিখুঁত নয়, এগুলো র‌্যানডম। বুনো একটা ব্যাপার আছে।’ আমার চোখের উদাসীনতা ইতিমধ্যেই লোভী দৃষ্টিতে রুপান্তরিত হয়েছে।
‘পুরানো বইয়ের প্রাচীন গন্ধটা যেমন নতুন কেনা বইতে পাওয়া যায়না তেমনি দোকানের কাঁচি দিয়ে সমান সাইজ করে কাটা ফুলের তোড়াতে বুনোফুলের নিজস্ব আবেদনটা থাকেনা। তাই কোন না কোন দিন চান্স পেলেই রাস্তা থেকে নিয়ে যাবো এই ফুল। ফুল কুঁড়ানোতে আমার জুড়ি নেই। ছোটবেলায় ফুলকুঁড়ানি খেলায় ফার্স্ট হয়েছিলাম আমি। আর তাছাড়া ফুল চুরি করার মধ্যে ব্যাপক আনন্দ আছে যেটা তুমি বুঝবানা।’


রাস্তার পাশের এলোমেলো ফুলগাছের দিকে লোভাতুর নয়নে তাকানোর ভঙ্গি দেখে যন্ত্রমানব এই বেলা বিপর্যস্ত একটা লুক দিলো। বললো ‘আশ্চর্য! ফুল চুরি করার কি আছে?’ আমি তার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলাম, খাঁটি বাংলায় যাকে বলে ভুবন ভুলানো হাসি।
তাড়াতাড়ি তাকে আশ্বস্ত করতে চাইলাম। বললাম ‘আহা সত্যি সত্যিই ফুল চুরি করতে যাচ্ছিনা। ফুল চুরি করবো, এটা ভাবার মাঝেই একটা ব্যাপক আনন্দ আছে যেটা এজ ইউজুয়াল তুমি বুঝবানা। প্ল্যানিং করেও মজাটা নিতে দিবানা, নাকি!’ যাহোক, কোনমতে বুঝ দিয়ে আবারো হাঁটতে লাগলাম।
চারপাশের প্রকৃতি বদলাতে শুরু করেছে ইদানিং। কদিন আগে বসন্ত থেকে উল্টে সোজা শীতে চলে এসেছিলাম। এখন আবার বসন্তে প্রবেশ করছি। এবারের বসন্তটা অন্যরকম। অন্য বসন্ত। আর সে অনন্যসাধারণ বসন্তকে হেসে খেলে হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে পিচের রাস্তার পাশে আর প্রত্যেক বাড়ির ঠিক সামনে বেড়ে ওঠা নাম না জানা এ বাহারি ফুলের গাছগুলো।
ভীষণ মায়াবী বিকেলে সূর্যের শেষ আলোয় নরম পাপড়ি মেলা এই ফুলেরা আমাকে মনে করিয়ে দেয় মিরিয়ামের কথা। নিয়ে যায় ডি এইচ লরেন্সের সেই গল্পের নায়িকার কাছে যে কিনা প্রেমিক পল এর হাত ধরে রোজ বিকেলে হেঁটে যেতো রঙিন ফুলের মাঝ দিয়ে, আর সময় পেলেই কুঁড়িয়ে নিতো থ্রি-নট-থ্রি অথবা ফরগেট-মি-নট ফ্লাওয়ার। আমি চারপাশে চেয়ে চেয়ে দেখি। এ দেখা ফুরায় না যেনো। বারবার পেছনে পড়ে যাই হাঁটার সঙ্গী থেকে। তারপরেও আমি আবিষ্কারের খুশীতে অদম্য। আবার একচ্ছুটে ফিরে যাই সখার কাছে। হাতে হাত রেখে বলে যাই সব বাহারি ফুলের গল্পগাঁথা। সাথে করে নিয়ে যেতে না পারলেও মনের গহীনে ওদের সৌন্দর্য লালন করার অভিপ্রায় নিয়ে এগিয়ে যাই সামনে, যেখানে আমাদের শহর, আমাদের ছোট্ট ঘর।

bn_BDBengali